সন্তানের শারীরিক বিকাশের পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও মানসিক বিকাশের যত্ন নেওয়া মোটেও সহজ নয়। কারণ মানসিক বিকাশের পরিবর্তন চোখে দেখা যায় না-এটি নীরবে, ধীরে ধীরে শিশুর চিন্তাভাবনা, আচরণ ও ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে। অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, আমাদের প্রতিদিনের কথা, আচরণ কিংবা অবহেলাই সন্তানের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে।
প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত সন্তানের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশের উপর সমান গুরুত্ব দেওয়া। কারণ শারীরিক শক্তির সঙ্গে মানসিক শক্তি যুক্ত হলে শিশুর জীবনে লক্ষ্য অর্জন অনেক সহজ হয়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনো অনেক অভিভাবক সন্তানের মানসিক বিকাশ ও অবচেতন মনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নন। অথচ প্রতিটি শিশুর শৈশবেই গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা। এই সময়ে করা ছোট ছোট ভুল ভবিষ্যতে বড় মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করবো সন্তানের মানসিক বিকাশে অভিভাবকদের করণীয় ও বর্জনীয় (Do & Don’ts)।কোন আচরণ শিশুর মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কোন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি। সঠিক প্যারেন্টিং এর মাধ্যমে কীভাবে একটি উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী শিশু গড়ে তোলা যায়-সেই বিষয়েই থাকবে সম্পূর্ণ গাইড।
সন্তানের মানসিক বিকাশ কী?
মানসিক বিকাশ বলতে সন্তানের বিভিন্ন আবেগকে সঠিকভাবে বোঝা, প্রকাশ করা এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়। মানুষের মনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক-উভয় ধরনের আবেগই থাকে; যেমন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রাগ, ভালো লাগা-খারাপ লাগা, দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত চিন্তা (Overthinking) এবং দৈনন্দিন আচরণ। এই সবকিছুই মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিশু সহ প্রত্যেক মানুষেরই এই আবেগ গুলোকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা রয়েছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিবেশ পেলে শিশু ধীরে ধীরে নিজের আবেগ বুঝতে শেখে এবং তা সুস্থভাবে প্রকাশ করতে পারে-যা ভবিষ্যতে তার মানসিক দৃঢ়তা ও আচরণগত ভারসাম্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
শরীরের তুলনায় মন বা মস্তিষ্ক মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা সাফল্য অর্জনে বেশি প্রভাব ফেলে। মানুষের মনকে সহজভাবে দুটি অংশে ব্যাখ্যা করা যায়- সচেতন মন (Conscious Mind) ও অবচেতন মন (Subconscious Mind)। এর মধ্যে অবচেতন মন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ঘুমের মধ্যেও সক্রিয় থাকে এবং আবেগ, স্মৃতি ও অভ্যাস গঠনে ভূমিকা রাখে।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়– আপনি যদি প্রতিদিন আপনার সন্তানকে বলেন, “তুমি খুব বাজে”, “তোমার বুদ্ধি এত কম কেন?”, “তুমি কিছুই পারো না দেখছি”, তাহলে এই ধরনের নেতিবাচক কথাগুলো সন্তানের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ধীরে ধীরে শিশু এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং তাঁর আচরন,অভ্যাস ও আত্মবিশ্বাস সেই ভাবেই গড়ে উঠে। তাই প্যারেন্টিং কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব যদি সঠিকভাবে পালন করা না যায়, তাহলে তার প্রভাব শিশুর জীবনে অন্ধকার ছায়া ফেলতে পারে।
সন্তানের জীবনে মানসিক বিকাশের গুরুত্ব:
সন্তানের মানসিক বিকাশ তার পুরো জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। অভিভাবকেরা যদি শিশুর জীবনে ২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সঠিক মানসিক বিকাশ গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে ১৮ বছরের পর, অর্থাৎ সাবালক বয়সে- সে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়ে ওঠে। কারণ শৈশবকালে আপনি আপনার সন্তানকে যে অভ্যাস, চিন্তাধারা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার দ্বারা বড় করেছেন, ঠিক সেগুলোর ওপরই ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্ব গঠন, চরিত্রের গুণাবলি এবং বাস্তব জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা নির্ভর করে।
সন্তান পড়াশোনায় ভালো ফল করলেও স্বনির্ভর হতে পারে না। এর প্রধান কারণ হলো তাদের লক্ষ্য ও মনোযোগ স্পষ্ট নয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিক সক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে আসে না
আবার দেখা যায়, অনেক সন্তান বাহ্যিকভাবে সফল হলেও তাদের আচরণ ও ব্যবহার অন্যের মনে কষ্ট দেয়। সামাজিক যোগাযোগে দুর্বলতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা এবং অপমানজনক ভাষায় কথা বলার অভ্যাস ধীরে ধীরে তাদের ব্যক্তিত্বকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে তারা সমাজে নিজেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে না এবং সুস্থ ও সুমধুর সম্পর্ক গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হয়।
তাই শিশুকে মানসিকভাবে এমনভাবে গড়ে তোলা জরুরি, যাতে সে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে সৎ ও সম্মানজনক মানসিকতা নিয়ে মিশতে শেখে। কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে হবে এবং কীভাবে অন্যের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে- এই শিক্ষা গুলোই শিশুর মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শক্তিশালী মানসিক বিকাশের উপকারিতা:
শক্তিশালী মানসিক বিকাশ শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং ইতিবাচক মনোভাব ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সঠিক মানসিক বিকাশ সম্পন্ন শিশু সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায় না এবং জীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে পারদর্শী হয়ে ওঠে।
শিশুর জীবনে শক্তিশালী মানসিক বিকাশের উপকারিতাগুলি হলো:
১.আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠে –
শক্তিশালী মানসিক বিকাশ শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মবিশ্বাস থাকলে লক্ষ্য অর্জন করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। যখন কেউ মনে মনে প্রতিদিন বলে-“I can do it”, অর্থাৎ আমি পারব, তখন সেই ইতিবাচক চিন্তাই তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। ফলে কোনো কাজ সহজ না হলেও আত্মবিশ্বাসের জোরে সেটি অর্জনযোগ্য বলে মনে হয়।
২.রাগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয় –
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বাভাবিক অবস্থায় তাদের আচরণ একরকম হলেও রাগের সময় সেই আচরণে বড় পরিবর্তন আসে। তাই সন্তানকে বোঝানো উচিত-রাগের সময় মানুষ অন্যের সঙ্গে যেমন আচরণ করে, সেটাই তার প্রকৃত চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতিফলন। মানুষের সামনে যে যতই ভালো হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, যদি কেউ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী বলা যায় না। শক্তিশালী মানসিক বিকাশের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো আবেগ, বিশেষ করে রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা।
৩.আদর্শ ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে-
আদর্শ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিশু বলতে শুধু শান্ত স্বভাবের বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে– এমন কাউকে বোঝায় না। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ খুব শান্ত, দায়িত্বশীল এবং সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করলেও যথাযথ সম্মান পায় না। এর কারণ হতে পারে- সে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না বা প্রয়োজনে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারে না। অতিরিক্ত মানিয়ে নেওয়া বা সবকিছু মেনে নেওয়া আদর্শ ব্যক্তিত্বের লক্ষণ নয়।
তাই সন্তানকে আদর্শ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাকে শেখাতে হবে- কীভাবে নিজের আবেগ ও মতামত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে হয়। ভদ্রতা ও আত্মসম্মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের পরিচয়।
৪.জীবনের সমস্যাগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে-
দুর্বল মানসিক বিকাশসম্পন্ন শিশুরা সমস্যা দেখলেই ভয় পায় এবং সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু শক্তিশালী মানসিক বিকাশসম্পন্ন শিশুরা সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা ব্যর্থতাকে শেষ নয়, বরং নতুন কিছু শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে এবং আবারও চেষ্টা করার সাহস রাখে।
৫.ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে-
শক্তিশালী মানসিক বিকাশ শিশুর মধ্যে ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন সন্তান কীভাবে নিজেকে সুখী ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখা যায়, সে বিষয়ে সচেতন ও দক্ষ হয়ে ওঠে।
৬.অন্যকে দোষারোপ না করে নিজেকে সংশোধন করার দক্ষতা রাখে-
ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা সম্পন্ন সন্তান বা ব্যক্তি সাধারণত অন্যকে দোষারোপ করে না। তারা নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে এবং ব্যর্থতার কারনগুলো খুঁজে বার করে। এরপর আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে একই ভুল না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থেকে নতুন করে আবার শুরু করে।
✍️টিপস: সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখান যে- “নিজের জীবনে আত্মসম্মানের থেকে বড় কিছু হতে পারে না।” আত্মসম্মান মানে অহংকার নয়; বরং নিজেকে ভালোবাসা, নিজের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের সম্মান বজায় রেখে অন্যকে সম্মান করা।
উল্লিখিত বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই শিশুর মধ্যে গড়ে তোলার চেষ্টা করলে সে ধীরে ধীরে সুস্থ ও গুণগত মানসিক বিকাশসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো-সন্তান সবচেয়ে বেশি শেখে তার অভিভাবকের কাছ থেকে। তাই অভিভাবকের মধ্যেই যদি এই ইতিবাচক গুণগুলো থাকে, তাহলে সন্তানকে শক্তিশালী মানসিকতায় গড়ে তোলা অনেক সহজ হয়। সন্তানকে বদলাতে চাইলে আগে নিজেকে বদলানোর সাহস রাখতে হবে, কারণ অভিভাবকের আচরণই শিশুর জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
Do: সন্তানের সঠিক ও উন্নত মানসিক বিকাশ গড়ে তোলার উপায়
শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশ নিজে থেকেই গড়ে ওঠে না। প্রাকৃতিকভাবে যা বিকাশ ঘটে, তা অনেকসময় সীমিত ও অনুন্নত থাকে। তাই উন্নত মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দক্ষ ও সচেতন ট্রেনার, এবং সেই ট্রেনার হলেন অভিভাবক। এই আর্টিকেলের মূল উদ্দেশ্য হলো অভিভাবকদের দেখানো- কীভাবে তারা সন্তানের মানসিক বিকাশকে শক্তিশালী, ইতিবাচক ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। নিচে উল্লেখিত উপায়গুলো শেয়ার করা হলো, যা প্রতিটি শিশুকে তার পূর্ণ সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
🧘মেডিটেশন করা:
দৈনিক ৫–১০ মিনিট মেডিটেশন সন্তানের মনকে শান্ত রাখে এবং তার চিন্তাভাবনাকে স্পষ্ট করে। মেডিটেশনকে বলা যায় মনের বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত প্রাকৃতিক থেরাপি। এটি শুধু শান্তির জন্য নয়, বরং শিশুর সমস্ত ইতিবাচক চিন্তা ও ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্যও অত্যন্ত কার্যকর উপায়।
✍️টিপস: অভিভাবক হিসেবে শুধু নয়, একজন সচেতন ট্রেনার হিসেবে সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন দু’বার মেডিটেশন করুন। এতে আপনার নিজেরও ভালো অভ্যাস গড়ে উঠবে এবং সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ডিং আরও মজবুত হবে।
🙇নিজের সঙ্গে কথা বলা:
অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখান যেন সে প্রতিদিন অন্তত একবার নিজের সঙ্গে কিছু শান্ত সময় কাটায়। একটি নিরিবিলি পরিবেশে, যেখানে অন্য কোনো বিভ্রান্তি নেই, সেখানে বসে তাকে নিজেকে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিন- আমি কে? আমার বিশেষ গুণগুলো কী? আমি কোন কাজে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী এবং কোন কাজ আমাকে আনন্দ দেয়?
এই ছোট্ট অভ্যাস শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের জগতকে চিনতে সাহায্য করে। নিজের সঙ্গে কথা বলা আত্মসচেতনতা বাড়ায়, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে এবং সন্তানের মানসিক বিকাশকে আরও গভীর ও পরিপক্ব করে।
❣️নিজেকে ভালোবাসা:
নিজেকে ভালোবাসার মতো সুখ বোধহয় খুব কম জিনিসেই পাওয়া যায়। নিজেকে ভালোবাসা মানে শুধু নিজের জন্য সময় বের করা বা বাহ্যিক যত্ন নেওয়া নয়, বরং ছোট ছোট অর্জনের জন্য নিজেকে পুরস্কৃত করা এবং আনন্দে রাখা।
উদাহরণস্বরূপ, সন্তানকে বলতে পারেন- যদি সে আজ ৫ পৃষ্ঠা বই পড়তে পারে, তাহলে তাকে তার পছন্দের কোনো খাবার খাওয়ানো হবে। আবার তাকে শেখাতে পারেন, যদি সে ভোরে উঠে যোগব্যায়াম করতে পারে, তাহলে সে যেন নিজের জন্য পছন্দের কোনো ছোট খাবার তৈরি করে নিজেকে পুরস্কৃত করতে পারে।
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাস শেখান যে, কোনো কিছু অর্জন করলে সে যেন প্রথমেই নিজেকে একটি ছোট উপহার দেয়। এই ছোট্ট self-reward তাকে নিজের সাফল্যকে মূল্য দিতে শেখায়, অনুপ্রেরণা বাড়ায় এবং নিজেকে ভালবাসতে শেখায়।
🌄দিন শুরু ও শেষ ভালো কিছু দিয়ে করা:
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখান যেন সে কখনোই নেতিবাচক চিন্তা দিয়ে দিন শুরু বা শেষ না করে। ঘুম থেকে উঠে তাকে নিজের কাছে অন্তত পাঁচটি ইতিবাচক বাক্য বলতে উৎসাহ দিন- আমি সাহসী, আমি পারব, আমি মূল্যবান, আমি সুখী, আমি সুস্থ।
একইভাবে দিনের শেষটাও ইতিবাচক হওয়া জরুরি। ঘুমানোর আগে অন্তত এক পৃষ্ঠা মোটিভেশনাল বা আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়ার অভ্যাস শিশুর অবচেতন মনে ভালো চিন্তার বীজ বপন করে। আর এই বীজ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি স্থির, আত্মবিশ্বাসী এবং পরিপক্ব মানসিকতা।
✅জীবনে ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা রাখা:
অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে বড় করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, সময়মতো খাওয়া এবং ঠিক সময়ে পড়াশোনা করার অভ্যাস শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সন্তান রাত জেগে পড়াশোনা করলে অভিভাবকেরা খুশি হন, কিন্তু নিয়মিত রাত জাগা শিশুর স্বাভাবিক রুটিন ও মানসিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বোঝান- ডিসিপ্লিন মানে কয়েক দিনের জন্য উৎসাহ নিয়ে কোনো কাজ করা নয়, বরং Consistency বজায় রেখে দীর্ঘ সময় ধরে ভালো অভ্যাস অনুসরণ করা। এই ধারাবাহিকতাই সঠিক অভ্যাস তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে তাকে জীবনে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়।
উপরের অভ্যাসগুলো নিয়মিত চর্চা করলে সন্তানের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি শক্ত ও সুস্থ মানসিক ভিত্তি তৈরি হয়। তবে শুধু কী করা উচিত তা জানাই যথেষ্ট নয়, অভিভাবক হিসেবে কী কী ভুল এড়িয়ে চলা দরকার সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় অজান্তেই করা কিছু আচরণ সন্তানের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
Don’t: সন্তানের মানসিক বিকাশে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি
সন্তানের মানসিক বিকাশে Do সেকশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি Don’t সেকশনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অভিভাবকেরা অজান্তেই এমন কিছু কথা বা কাজ করেন, যা শিশুর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সচেতন অভিভাবক হিসেবে কোন আচরণগুলো সন্তানের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তা জানা এবং সেগুলো থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সন্তানের সামনে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া দেখাবেন না:
স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যত বড়ই ঝামেলা বা মতবিরোধ থাকুক না কেন, সন্তানের সামনে সেটার বহিঃপ্রকাশ করা উচিত নয়। অনেক অভিভাবক অনিচ্ছাকৃতভাবে এই ভুলটি করেন। এর ফলে শিশুর মানসিক স্থিতি, নিরাপত্তাবোধ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সন্তানের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, তাকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত মনে করানো সবচেয়ে জরুরি।
সন্তানের সঙ্গে তুলনা করা এড়িয়ে চলুন:
সন্তানকে অন্যদের সঙ্গে বারবার তুলনা করলে তার আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং সে নিজেকে অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আপনার সন্তান ৮০% মার্কস পেয়েছে। ক্লাসে অন্যরা কত পেয়েছে তা উল্লেখ না করে তাকে বলুন: “৮০% ভালো হয়েছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তুমি ৯৫% পাওয়ার যোগ্য। কারণ তোমার বুদ্ধি অনন্য এবং তুমি অন্যদের থেকে আলাদা।” এরপর তাকে উৎসাহ দিন যে এইবারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ৯৫% নম্বর পাওয়ার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করো।
অতিরিক্ত বকাঝকা এবং ভালোবাসা দেবেন না:
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত বকাঝকা বা অতিরিক্ত ভালোবাসা দেওয়া উচিত নয়। ধরুন আপনি সন্তানকে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে রাখেন এবং ছোটখাট ভুলের জন্য বকাঝকা বা শাস্তি দেন। এর ফলে সন্তান হয়তো বাহ্যিকভাবে ভয় পাবে, কিন্তু মন থেকে আপনার প্রতি সম্মান বা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারবে না।ভয় মূলত দুই ধরনের হতে পারে:
১.সম্মানের সঙ্গে ভয়: সন্তান আপনাকে ভয় পায়, কিন্তু তার অন্তরে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা থাকে। এটি অনুশোচনার মাধ্যমে জন্ম নেওয়া ভয়।
২.অসম্মানের সঙ্গে ভয়: সন্তান বাহ্যিকভাবে ভয় প্রকাশ করে,কাঁপতে পারে বা চোখে ভয়ের ছাপ থাকে-কিন্তু অন্তরে আপনার জন্য কোনো সম্মান বা শ্রদ্ধা নেই। এটি শুধুমাত্র শাস্তির ভয়।
অপরদিকে, ভালোবাসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও লিমিট থাকা জরুরি, যাতে সন্তান আপনার মূল্য বুঝতে পারে এবং আবেগগতভাবে সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
সন্তানের অনুভূতিকে অবহেলা করবেন না:
শিশুর ছোট ছোট দুঃখ, ভয় বা চিন্তাকে “এগুলো কিছু না” বলে এড়িয়ে গেলে সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়। এতে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।
সন্তানের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলবেন না:
সন্তানের সামনে বা অন্যের কাছে তাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। বারবার “তুমি পারবে না”, “তুমি খুব অলস” বা “তুমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারো না”- এ ধরনের কথা শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। শিশু একসময় এসব কথাকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তাই সন্তানের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সময়ও এমন ভাষা ব্যবহার করুন, যা তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং উন্নতির জন্য অনুপ্রাণিত করে।
জেন্ডার অনুযায়ী কাজের বিভাজন করবেন না:
সন্তান ছেলে না মেয়ে- এই ভিত্তিতে তার কাজ বা দক্ষতার সীমা নির্ধারণ করবেন না। ছেলে সন্তান বলে সে রান্না শিখতে পারবে না বা মেয়ে সন্তান বলে সে বাইক চালাতে পারবে না-এমন মানসিকতা দিয়ে সন্তানকে বড় করা ঠিক নয়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। বরং তাকে শেখান- কাজের কোনো লিঙ্গভেদ নেই, যে কোনো দক্ষতা শেখার অধিকার সবার আছে এবং জীবনে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে সন্তান আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী এবং বাস্তব জীবনের জন্য বেশি প্রস্তুত হয়ে উঠবে।
উপসংহার:
সন্তানের মানসিক বিকাশ কোনো একদিনে তৈরি হয় না, এটি ছোট ছোট অভ্যাস, সচেতন আচরণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার প্রতিটি কথা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত সন্তানের মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। সঠিক অভ্যাস চর্চা করা এবং ক্ষতিকর আচরণ এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখবেন, একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক মানসিকতার সন্তান গড়ে তোলার শুরুটা হয় পরিবারের ভেতর থেকেই। তাই বিস্তারিত জানতে এবং সন্তানের শারীরিক ও মানসিক যত্নসহ হোম ম্যানেজমেন্টের পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেখতে “হোম ম্যানেজমেন্ট এর সন্তান লালন-পালন ও তাদের যত্ন” আর্টিকেলটি পড়ুন।
2 thoughts on “সন্তানের মানসিক বিকাশ: Do & Don’ts সহ প্যারেন্টিং গাইড”