গৃহ পরিচালনায় সময় ব্যবস্থাপনা;গৃহকর্মে সময় বাঁচানোর কৌশল:

ভূমিকা:

পৃথিবীতে যত সম্পদ আছে, তার মধ্যে সময় হলো একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সম্পদকে চোখে দেখা যায় না, হাতে ধরা যায় না, তবুও এর মূল্য অপরিসীম। জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত ও প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। সুখ-দুঃখ, টাকা-পয়সা, বাড়ী- গাড়ি জীবনে আসবে এবং যাবে কিন্তু সময় চলে গেলে তাকে কোনো ভাবেই ফিরে পাওয়া যায় না। তাই গৃহিণী সহ প্রত্যেকের সময় সর্ম্পকে সচেতন হওয়া দরকার।

🕙সময় ব্যবস্থাপনা কী?

সময় ব্যবস্থাপনা হলো সাফল্যের চাবিকাঠি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজগুলো সম্পন্ন করাকেই সময় ব্যবস্থাপনা বলা হয়। সময়ের সঠিক ব্যবহার মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। এই পরিবর্তন উন্নতির দিকেও হতে পারে, আবার অবনতির দিকেও যেতে পারে। আপনি যত বেশি সময়কে ইতিবাচক ও সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করবেন, তত বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।

গৃহস্থালিতে সময় নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ-

  • আগাম পরিকল্পনার অভাব।
  • নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব।
  • একটি কাজ শেষ না করে অন্য একটি কাজ শুরু করা।
  • অপ্রয়োজনীয় কাজ ও অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার।
  • আগে বাড়িয়ে অন্যর কাজে সাহায্য করা।
  • নিজের প্রয়োজন ভুলে গিয়ে সবসময় অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

উল্লিখিত কারনগুলো চিহ্নিত করতে পারলে সময় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

গৃহকর্মে সময় ব্যবস্থাপনার কার্যকর কৌশল:

গৃহকর্মে সময় ব্যবস্থাপনার জন্য কিছু কার্যকর কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও সুশৃংখল গড়ে তোলে –

  • দৈনিক কাজের তালিকা তৈরি করা – প্রতিদিন কি কি কাজ করতে হবে এবং সারাদিনে আপনি কতটুকু কাজ করতে পারবেন তার একটা তালিকা তৈরি করা উচিত। এতে কাজের চাপ কমে এবং কোন সময়ে কোন কাজটি করতে হবে পরিষ্কারভাবে পরিকল্পনা করতে পারবেন।
  • কাজের অগ্রাধিকার বিবেচনা করা – একসঙ্গে সব কাজকে একইরকম ভাবে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কোন কাজটি আগে করা জরুরি আর কোন কাজটি পরে করা জরুরি- এটি বুঝে নেওয়াই হলো সময় ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি।
  • নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারন করা – প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারন করলে নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখা সহজ হয় এবং কাজটি সম্পন্ন করার মানসিকতা তৈরি হয়। কারন, আপনি ওই কাজটির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দিয়েছেন। যেমন- ধরুন আপনি দুপুর ১টায় নিজের যত্নের জন্য সময় রাখবেন, যেমন ফেসিয়াল ম্যাসাজ করবেন।তাহলে দুপুর ১ টার আগে দিনের অন্যান্য জরুরি কাজ শেষ করার একটি স্বাভাবিক চাপ তৈরি হবে, যা আপনাকে সময় মতো কাজ শেষ করতে সাহায্য করবে।
  • কাজ ভাগ করে নেওয়া – অনেক গৃহিনীকে দেখা যায় সবার প্রশংসা পাওয়ার আশায় একাই সব কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। মনে রাখতে হবে, আপনি একজন গৃহিনী অর্থাৎ পরিচালিকা- সব কাজ একা করার দায়িত্ব আপনার নয়। তাই পরিবারের সদস্যদের তাদের কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়াও হোম ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে আপনি মানসিকভাবে চাপ মুক্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত থাকবেন।

গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনার টিপস:

গৃহিণী ও কর্মজীবী নারী – উভয়ের ক্ষেত্রে সময় ব্যবস্হাপনা সমান জরুরি। নিচে উভয়ের জন্য কিছু টিপস রাখলাম এগুলো কাজে লাগিয়ে আপনি আপনার মুল্যবান সময় বাঁচাতে পারবেন।

টিপস ১: রাতে ঘুমনোর আগে পরের দিনের কাজ মনে মনে সাজিয়ে নেওয়া-

রাতে ঘুমোনোর আগে অন্তত একবার চোখ বন্ধ করে মনে মনে পরিকল্পনা করুন- পরের দিন সকালে প্রথমে কোন কাজটি করবেন, সেই কাজটি শেষ করে তারপর কোন কাজটি শুরু করবেন। এইভাবে পরিকল্পনা করে ঘুমিয়ে পড়ুন। এতে আপনার অবচেতন মন সারারাত আপনার পরিকল্পনা গুলোকে মনে রাখে এবং পরের দিন সকালে আপনি পূর্ণ উদ্যমে আরও সহজভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারবেন। অনুরোধ রইলো একবার এই পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখুন। দেখবেন কাজের চাপ অনুভব হবে না কারণ আপনার শরীর ও মন কাজ সম্পন্ন করার জন্য আগের দিন থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছে।

টিপস ২: একসঙ্গে একাধিক কাজ করে সময় ও গ্যাস সাশ্রয় করুন-

কিছু সবজি ভাজা করার আগে হালকা সেদ্ধ করে নিতে হয় যেমন ফুলকপি, বিনস। একটু বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে এই কাজটিকে আরও সহজ ভাবে করা যায়। ধরুন আপনি উনুনে ভাত বসিয়েছেন, সেই ভাতের পাত্রের ওপরে ভাপা পুর পিঠের স্টিমার পাত্র বসিয়ে তাতে সবজি দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিন। এতে একসঙ্গে দুটি কাজ হয়ে যাবে-ভাত ও ফুটবে আবার সবজিগুলো স্টিমার এর মাধ্যমে হালকা সেদ্ধও হয়ে যাবে। এরফলে গ্যাস যেমন বাঁচবে, তেমনই সময়ও সাশ্রয় হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে ভাতের বাবল উঠার আগেই সবজি গুলো নামিয়ে নিতে হবে, যাতে বাবল গুলো সবজির সঙ্গে না লাগে।

টিপস ৩: সন্তানকে আত্মনির্ভর হতে সেখান ও সময় বাঁচান-

সন্তানকে যতটুকু সময় দেওয়া প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই দিন। বাচ্চার বয়স সাড়ে তিন থেকে চার বছরের কাছাকাছি হলে তার পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা উচিত। এই বয়সে অনেক শিশু নিজে হাতে খেতে পারে, নিজের খেলনা ও বইপত্র গুছিয়ে রাখতে শিখে যায়। তাই প্রতিটি ছোট কাজে সাহায্য না করে সন্তানকে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ দিন। সন্তানকে আত্মনির্ভর করে তোলা প্রতিটি বাবা-মায়ের দায়িত্ব।

উদাহরন: আপনি আপনার সন্তানকে এভাবে বলতে পারেন- “সোনা আমরা আজ একইসঙ্গে ভাত খাবো মাম্মামকে একটু সাহায্য করবে চলো- সোনা টেবিলে জল রেখে দিয়ে আসো, তরকারি গুলো নিয়ে যাও, তোমার খাওয়ার প্লেট টা নিয়ে যাও”

এই ভাবে সন্তানকে ছোটো ছোটো কাজের দায়িত্ব দিলে সে খুশি হয়েই কাজ গুলো করবে, এতে সন্তান আত্মনির্ভর হতে শিখবে এবং আপনি আপনার সময়টাও সঞ্চয় করতে পারবেন।

প্যারেন্টিং ও সন্তান-লালন নিয়ে আগামী দিনে আলাদা একটা আর্টিকেল আসবে, যেখানে আরও কার্যকর টিপস শেয়ার করা হবে। চাইলে ফলো করে রাখতে পারেন।

গৃহস্থালিতে সময় ব্যবস্থাপনার উপকারিতা:

সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জীবন অনেক সহজ ও সুন্দর হয়ে উঠে। এর উপকারিতা গুলো হলো-

  1. মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
  2. বার বার পরিকল্পনা ও সময় কে কাজে লাগিয়ে কাজ করলে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
  3. নিজে এবং সন্তান দুজনেই আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে থাকা যায়।
  4. সন্তানের মধ্যে আত্মনির্ভরতার অভ্যাস গড়ে উঠে ।
  5. সবসময় নিজের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা বজায় থাকে।
  6. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করলে মস্তিষ্ক এটিকে একটি অর্জন হিসেবে গ্রহণ করে এবং ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যার ফলে আপনি নিজেকে আনন্দিত ও আত্মবিশ্বাসী অনুভব করেন।

🕗অল্প সময়ে তৈরী করা যায় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট রেসিপি:

অল্প সময়ে তৈরী করা যায় এমন স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট রেসিপি যা বাচ্চা থেকে বড় সবার জন্য উপযোগী।

১.ভেজিটেবল ডালিয়া

প্রেশার কুকারে এক চামচ বাটার, গোটা জিরে, গোটা গরম মসলা, পেঁয়াজ কুচি, অল্প আদা কুচি দিয়ে একটু ভেজে নিন। তারপর তাতে পরিমাণ মতো নুন, হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, টমেটো সব মশলা দিয়ে একটু কষিয়ে নিন । এবার আপনার পছন্দ মত সবজি দিয়ে যেমন – গাজর, বিনস, মটরশুঁটি সঙ্গে ডালিয়া দিয়ে একটু কষিয়ে নিয়ে প্রয়োজন মতো জল দিয়ে ঢাকনা লাগিয়ে দিন। দশ মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে উচ্চ ক্যালোরি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার।

২. ওটস ওমলেট

ডিমের মধ্যে ওটস, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা লঙ্কা কুচি এবং একদম অল্প পরিমান গ্রেট করা গাজর যোগ করতে পারেন। সব উপকরণকে একদঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপর কড়াইতে অল্প তেল দিয়ে মিডিয়াম আঁচে ঢাকনা দিয়ে ওমলেটের এর মত করে ভেজে নিন। ওমলেটটি দুই পিঠ সোনালী হয়ে গেলে নামিয়ে নিন এবং গরম গরম টমেটো সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন। এটি বাচ্চা ও বড় দুজনের জন্য স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট।

✅টিপস:

আগে থেকে পরিকল্পনা করে ওটস কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে ওটস নরম হয়ে যায়, ফলে অমলেটটি সহজে সেদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত সময় লাগে না।

উপসংহার:

সবশেষে বলা যায় সময় ব্যবস্থাপনা হলো সুশৃংখল জীবন ও ভালো অভ্যাসের মূল চাবিকাঠি। সময় ব্যবস্থাপনা কোনো কঠিন বিষয় নয়। শুধু কোন কাজটি কখন করবেন এবং প্রতিটি কাজের পিছনে কতটুকু সময় ব্যয় করবেন, তা পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

1 thought on “গৃহ পরিচালনায় সময় ব্যবস্থাপনা;গৃহকর্মে সময় বাঁচানোর কৌশল:”

Leave a Comment