হোম ম্যানেজমেন্ট কী? সহজ উপায়ে বাড়ি পরিচালনা করার কৌশল:

ভূমিকা

হোম ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ সংসার সামলানো বর্তমান যুগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সময়ের অভাব, নিজের যত্ন, বাচ্চার দায়িত্ব, সংসার গুছিয়ে রাখা, বাড়তে থাকা খরচ – সবকিছু একসাথে ঠিকভাবে সামলাতে না পারার কারণে আমাদের জীবনে অস্থিরতা তৈরি হয়। দিন শেষে মনে হয় আমার জীবনে বোধহয় এত মানসিক চাপ। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনি যদি পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে পারেন তাহলে আপনার দিন ও জীবন অনেক সহজ ও সরল হয়ে উঠবে এবং আপনি নিজেকে সুখী অনুভব করবেন।

হোম ম্যানেজমেন্ট কী?

ম্যানেজমেন্ট হলো একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সহজভাবে পৌঁছাতে পারি। এককথায় বলতে গেলে ম্যানেজমেন্ট প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যেমন – ব্যবসা, শিক্ষা, সরকারি ক্ষেত্রে, হাসপাতাল, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও। আর হোম ম্যানেজমেন্ট হলো এমন একটি বিষয় যা বাড়ির সমস্ত কাজ কে পরিকল্পনা করে সুন্দর ও সহজভাবে পরিচালনা করা যায়।

এর মধ্যে শুধু ঘরের কাজই নয়, বরং পরিবার এর আর্থিক পরিকল্পনা, পারেন্টিং অর্থাৎ সন্তান লালন পালনে পিতা মাতার দায়িত্ব, নিজেকে পজিটিভ রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করা এগুলো সবই অন্তর্ভুক্ত।

হোম ম্যানেজমেন্ট কেন জরুরি?

হোম ম্যানেজমেন্ট মানে শুধু ঘর গুছিয়ে রাখা নয়, এর প্রভাব হলো পুরো পরিবারের উপর পড়ে। বাচ্চা থেকে শুরু করে বড়রা সবাই হোম মেকারের উপর নির্ভরশীল। তাই একজন দক্ষ ও নিখুঁত হোম মেকার হতে গেলে হোম ম্যানেজমেন্ট এর গুরুত্ব জানা খুবই প্রয়োজন।

হোম ম্যানেজমেন্ট জরুরি কারন –

  • ঘর সুন্দর ও পরিপাটি দেখায়।
  • সময়ের সঠিক ব্যবহার করা যায়।
  • চাপমুক্ত থাকা থাকা যায়।
  • ইতিবাচক (positiveness) মনোভাব বজায় থাকে।
  • আপনার পার্সোনালিটি কে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
  • বাড়িতে অতিথিরা আসলে শান্তি অনুভব করে।

ভালো হোম ম্যানেজমেন্টের জন্য একজন গৃহিণীর কি কি গুন থাকা দরকার?

হোম ম্যানেজমেন্টের মূল কেন্দ্রে থাকেন একজন হোম মেকার বা গৃহিণী যিনি পুরো বাড়ি পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। রুম ডেকোরেশন থেকে শুরু করে বাচ্চার যত্ন, বাজেট, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন – সবকিছুই তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই একজন নিখুঁত ও দক্ষ হোম মেকার হতে গেলে কি কি গুন থাকা দরকার সেটা জানবো।

তবে আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হোম মেকার মানে শুধু যে একজন নারীকে বোঝায়- এমনটা ভাবা ঠিক নয়। সংসারে শান্তি ও সুখ বজায় রাখতে চাইলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই হোম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।

দক্ষ হোম মেকারের গুণাবলী –

  1. ভবিষ্যত নিয়ে পরিকল্পনা করার ক্ষমতা থাকা– যে কোনো কাজ শুরু করার আগে বা কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে যদি একজন হোম মেকার সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে নিতে পারেন, তাহলে সেই কাজে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায় কারণ প্রতিটি কাজের সঙ্গে সময়, অর্থ ও পরিশ্রম জড়িত থাকে। তাই আগাম পরিকল্পনা থাকলে এই তিনটি বিষয়ই সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয় ভুল এড়ানো যায়।
  2. সঞ্চয় করার মানসিকতা থাকা- সংসারে উন্নতির জন্য সঞ্চয় করার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি। আমি অনেক গৃহিনীকে দেখেছি, যারা সংসারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না- এর একটি বড় কারন হলো নিয়মিত সঞ্চয় না করা। ছোট্টো উদাহরন দিয়ে বলি, আজ আপনার একটি সাইকেল আছে আগামীকাল একটা বাইক হতে পারে আর ভবিষ্যতে এটা গাড়ী কেনার স্বপ্ন পূরণও হতে পারে। এইসব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে সঞ্চয় বাধ্যতামূলক।
  3. ইতিবাচক মনোভাব থাকা – একজন ভালো গৃহিণীর ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা থাকা জরুরি। মনে রাখবেন, ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তি সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে, আর নেতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন ব্যাক্তি সমস্যাকে ভয় পান আর নিজেকে অসুখী অনুভব করে।
  4. সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা থাকা – হোম ম্যানেজমেন্টের অন্যতম প্রধান বিষয় হল সময় ব্যবস্থাপনা বা টাইম ম্যানেজমেন্ট। সময় সম্পর্কে সচেতন না হলে একদিনে অনেক কাজ সঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না। কোন সময় কোন কাজ কতটুকু করা যাবে, তা আগেই পরিকল্পনা করে সময় নির্ধারণ করে নিলে কাজ সহজ হয় এবং মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

হোম ম্যানেজমেন্টের বিভাগ সমূহ –

হোম ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত। একটি সংসারকে সুখী ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার জন্য হোম ম্যানেজমেন্টের বিভাগ গুলোর ওপর সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিম্নে হোম ম্যানেজমেন্টের বিভাগ সমূহ কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১.পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা (Family Finance Management):

সংসারে আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা হোম ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট তৈরি, সঞ্চয় করা, এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব হয়।

২.সময় ব্যবস্থাপনা (Time and Routine Management):

প্রতিটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সময় ব্যবস্থাপনা বা টাইম ম্যানেজমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। করণ সংসারের প্রতিদিনের কাজ সম্পন্ন করতে প্রথমেই সময়ের প্রয়োজন হয়। গৃহিণী থেকে শুরু করে প্রত্যেক মানুষের জীবনে সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম।

৩.সংসারে দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা:

একসঙ্গে সব কাজ সম্পন্ন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা। আর যেকোনো কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী করলে কাজের যেমন দক্ষতা বাড়ে তেমনি কাজটি সুষ্ঠ ও সঠিক ভাবে সম্পন্ন করা যায়।

৪.সন্তান লালন-পালন এবং তাদের যত্ন(Parenting & Child Care):

হোম ম্যানেজমেন্টের অন্যতম কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সন্তান লালন-পালন ও তাদের সঠিকভাবে যত্ন নেওয়া । আপনার সন্তান হলো পরিবারের সবচেয়ে মূলবান সম্পদ এবং আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই সন্তান লালন পালন বা প্যারেন্টিং কি ,ও কেনো তা জরুরি এবং কিভাবে সঠিকভাবে করা যায়- এই বিষয় গুলো সম্পর্কে জানা প্রতিটি হোম মেকারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

৫.পরিবারের স্বাস্থ্য ও লাইফ স্টাইল ম্যানেজমেন্ট:

পৃথিবীতে যত সম্পদ আছে তারমধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো স্বাস্থ্য। আপনার আছে অনেক ব্যাংক ব্যালেন্স,বাড়ি বা গাড়ি থাকতে পারে, কিন্তু আপনি যদি অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকেন, তাহলে প্রকৃত অর্থে কি আপনি সুখী হতে পারবেন? তাই হোম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে প্রথমেই নিজের এবং পরিবারের সবার স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

৬.পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক গঠন ও মানসিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা:

হোম ম্যানেজমেন্টের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক গঠন ও মানসিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকলে সংসারে শান্তি বজায় থাকে।

৭.গৃহসজ্জা ও গৃহ সংগঠন (হোম ডেকোরেশন ও অর্গানাইজেশন):

প্রত্যেকটা মানুষের রুচি আলাদা আলাদা হয়। কিন্তু নিখুঁত গৃহসজ্জা সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে ঘরের কোন কর্ণারে কোন জিনিষ রাখলে আরও সুন্দর, পরিপাটি ও ছিমছাম দেখাবে তা সহজেই বুঝতে পারবেন।

উল্লিখিত হোম ম্যানেজমেন্টের প্রতিটি বিভাগ সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে এই ওয়েবসাইডে পরবর্তী আর্টিক্যাল গুলো পড়তে পারেন।

উপসংহার-

সবশেষে বলা যায়, হোম ম্যানেজমেন্ট শুধু বাড়ি পরিচালনা করাকেই বোঝায় না। এই বিষয়ের জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে আপনি অপনার মূল্যবান সময় বাঁচাতে পারেন, একজন আদর্শ মা হতে পারেন, এবং নিজের ব্যক্তিগত মূল্য বাড়াতে পারেন। আপনি যে একজন দামী মানুষ- তা আপনার কাজ, ব্যবহার ও অপনার জীবন ধারাই তুলে ধরবে। তাই পরবর্তী আর্টিক্যাল গুলো মিস করবেন না। আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা গুলো শেয়ার করব, যাতে অপনার দিনগুলো সহজ, সুন্দর ও স্ট্রেস-ফ্রি হয়ে উঠে।

Leave a Comment