ভূমিকা:-
সন্তান হলো প্রতিটি পরিবারের মূল্যবান সম্পদ। সন্তান লালন-পালন প্রতিটি বাবা মায়ের জীবনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। সন্তান মানুষ করা বলতে কেবল উচ্চশিক্ষিত বা ডিগ্রিধারী জ্ঞানার্জন করাকে বোঝায় না। প্রকৃত অর্থে সন্তান মানুষ করা বলতে বোঝায়- তাকে পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ একটি জীবন উপহার দেওয়া। এই উপহারই পৃথিবীর সেরা উপহার, কারণ এর মাধ্যমে পিতা মাতা শুধু নিজের সন্তানকেই নয়, বরং পুরো সমাজকে মূল্যবান ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম উপহার দেন।
সন্তানের কাছ থেকে পিতা-মাতারা যেমন আচরণ ও গুণাবলী আশা করে থাকেন, ঠিক তেমন গুণাবলী তাদের নিজেদের মধ্যেও থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারন সন্তান তার জীবনের প্রথম শিক্ষা পায় বাবা-মা ও পরিবার থেকেই। বাবা-মার আচরণ, চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনই সন্তানের চরিত্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। তাই একজন আদর্শ সন্তান গড়ে তুলতে হলে আগে পিতা-মাতাকেই একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যায়। ধরুন, একজন বাবা নিয়মিত মদ্যপান বা সিগারেট খান, অথচ সন্তানের কাছ থেকে আশা করেন সে যেন কোন ধরনের নেশায় জড়িয়ে না পড়ে। এই অবস্থায় পিতা হিসেবে সন্তানকে যতই বকাঝকা বা শাসন করুন না কেন, হয়তো ভয়ের কারণে সে আপনার সামনে এসব কাজ করবে না, কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে নেতিবাচক অভ্যাসের দিকে এগোনোর চেষ্টা করতে চাইবে। তাই সন্তানকে প্রকৃত অর্থে মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চাইলে, আগে নিজেকেই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সন্তান লালন-পালনের অর্থ:
সন্তান লালন-পালন বলতে শুধুমাত্র সন্তানের দৈনন্দিন প্রয়োজন যেমন- খাদ্য, ব্রস্ত,বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করাকেই বোঝায় না। প্রকৃত অর্থে সন্তান লালন পালন হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে একটি শিশুকে ধীরে ধীরে জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স পর্যন্ত শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিকভাবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা হয়।
সন্তানকে অতিরিক্ত কঠোর শাসন বা কড়া নিয়মের মধ্যে বড় করে তুললেই যে সেটি সঠিক প্যারেন্টিং-এমনটি নয়। প্রকৃত অর্থে ভালো প্যারেন্টিং হলো সন্তানের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠা। বাবা-মা যখন সন্তানের কাছে তার “বেস্ট ফ্রেন্ড” হতে পারেন, তখন সন্তান নিজের ভুল, আবেগ কিংবা সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় তাঁদের সঙ্গে শেয়ার করতে শেখে। তবে এই সময়ে যদি সন্তানের কথা শোনার পরিবর্তে তাকে শুধু বকাঝকা বা শাসন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সে আর কোনো বিষয়ই বাবা-মার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইবে না।
একটি ছোট বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরুন, আপনার সন্তান স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে চলে গেছে এবং পরে জানতে পারলেন সে স্কুলে অনুপস্থিত ছিল। এই অবস্থায় সন্তানের ওপর রাগারাগি বা মারধর করার পরিবর্তে ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝিয়ে বলা উচিত—“এইভাবে বাবা-মাকে মিথ্যা বলা কি ঠিক হয়েছে? যদি তোমার ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকত, তাহলে আমাদের বলতে পারতে। আমরা একসঙ্গে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু লুকিয়ে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার ফলে তোমার কোনো লাভ হয়নি, বরং নিজেরই ক্ষতি হয়েছে। আমি আশা করি এবং তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে-তুমি দ্বিতীয় বার এমন ভুল আর করবে না।”
হোম ম্যানেজমেন্ট অনুযায়ী শিশুর যত্ন নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি:
হোম ম্যানেজমেন্ট শুধু ঘরের কাজ গুছিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সন্তানদের সঠিক লালন-পালন ও তাঁদের যত্ন নেওয়া। তবে এই ব্যস্তময় জীবনে অন্যান্য কাজ কিছুটা সহজে ম্যানেজ করা গেলেও প্যারেন্টিং-অর্থাৎ শিশুর লালন-পালন ও যত্ন নেওয়া-অনেক সময়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে কর্মরত পিতা-মাতার ক্ষেত্রে সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করে তোলা একটি জটিল বিষয়। তবে বুদ্ধিমত্তা, পরিকল্পনা এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্যারেন্টিং প্রক্রিয়াকে অনেকটাই সহজ ও কার্যকর করা সম্ভব।
শিশুর যত্ন নেওয়া মানে শুধু তার শারীরিক চাহিদা পূরণ করা নয়। এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা বা নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়াই যত্নের একমাত্র দিক নয়। এর পাশাপাশি শিশুর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ও আবেগগত দিক রয়েছে, যা অনেক সময় বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যরা অজান্তেই উপেক্ষা করে থাকেন। নিচে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক যত্ন কীভাবে করা উচিত-সে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
শিশুর শারীরিক যত্ন:-
প্রথমত: কর্মরত মা হোন বা গৃহিণী- ০ থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত সন্তানের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বয়সে শিশুরা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে মূলত কান্নার মাধ্যমেই। প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা মাকে এমন এক বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি সন্তানের কান্নার ধরণ শুনেই বুঝে নিতে পারেন শিশুর কী সমস্যা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত বিষয় হলো- ০ থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রতিটি মায়েরই চেষ্টা করা উচিত, এই সময়টাতে সন্তানের যত্ন যতটা সম্ভব নিজের হাতে নেওয়ার।
দ্বিতীয়ত: ৬ মাস বয়স পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কর্মরত মায়েরা সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকার কারণে সন্তানের খাবারের দিকে সব সময় পূর্ণ মনোযোগ দিতে না পারাটা স্বাভাবিক। তবে প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় ডিম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রাকৃতিক সমৃদ্ধ প্রোটিন পাউডার দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে অভিভাবক হিসেবে একটি নিশ্চয়তা থাকে যে শিশুর শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি হচ্ছে না।
তৃতীয়ত: সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলতে শুধু নতুন জামা-কাপড় পরানোই বোঝায় না, বরং শিশুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিয়মিত পরিচর্যা করাটাই আসল যত্ন। এতে শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং সে আরও সজীব ও সতেজ দেখায়। পাশাপাশি শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও স্বাভাবিকভাবেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে শেখে, যা ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক হয়।
সন্তানের মানসিক ও আবেগগত যত্ন:-
শিশুর শারীরিক যত্ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মানসিক ও আবেগগত যত্ন। শারীরিক বিকাশের কোনো ত্রুটি সহজেই চোখে পড়লেও মানসিক বিকাশে ঘাটতি বা যত্নের অভাব প্রায় সময় চোখে দেখা যায় না। অথচ এই অদৃশ্য ঘাটতি গুলোই ভবিষ্যতে শিশুর আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের মানসিক ও আবেগগত যত্নের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
সন্তানের মানসিক ও আবেগগত যত্নের দিকগুলি হলো –
প্রথমত: প্রত্যেক বাবা-মায়ের একটি বিষয় মনে রাখা উচিত-সন্তানের শারীরিক যত্ন পরিবারের যে কেউ নিতে পারে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে গভীর আবেগগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে মূলত বাবা-মায়ের সঙ্গেই। তাই সন্তানের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, রাগ কিংবা হতাশা-প্রতিটি অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
দ্বিতীয়ত: সন্তানের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করুন। তাকে নিজের কথা বলার সুযোগ দিন। তার মনে জমে থাকা কৌতূহল জনিত প্রশ্নগুলোর উত্তর ধৈর্য নিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
বাস্তব উদাহরণ- সন্তান স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর তাকে পাশে বসিয়ে গল্পের ছলে জিজ্ঞেস করুন-“সোনা, আজ তোমার দিনটা কেমন কাটল? স্কুলে কী কী ঘটেছে?”
তৃতীয়ত: প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। তার সঙ্গে খেলাধুলা করুন, একসঙ্গে আঁকুন, কিংবা ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে সহায়ক গেমগুলো একসঙ্গে খেলুন।
চতুর্থত: ছোট শিশু সকালে ঘুম থেকে উঠলে অন্তত ৫ মিনিট তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার চেষ্টা করুন। আদর করতে করতেই ভালোবাসা দিয়ে মিষ্টি সুরে বলুন-যেন সে সারাদিন খারাপ বা নেতিবাচক কাজ থেকে দূরে থাকে এবং মায়ের কথা একজন ভালো সন্তানের মতো শোনে।
উপসংহার (conclusion)
সন্তান লালন-পালন ও তাদের যত্ন নেওয়া শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সচেতন ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। হোম ম্যানেজমেন্টের সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সন্তানের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক ও আবেগগত যত্ন নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ একটি শিশু শুধু খাবার, পোশাক বা চিকিৎসা পেলেই পরিপূর্ণভাবে বড় হয় না – তার জন্য প্রয়োজন ভালোবাসা, সময়, বোঝাপড়া ও সঠিক দিকনির্দেশনা।
বাবা-মা যদি নিজেদের আচরণ, চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তবে সন্তানও ধীরে ধীরে একজন সুস্থ মানসিকতা-সম্পন্ন, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের সঠিক লালন-পালনই আগামী দিনের একটি সুন্দর পরিবার ও সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি।
👉পরবর্তী আর্টিকেলে আমরা তুলে ধরেছি সন্তানের মানসিক বিকাশে Do’s & Don’ts সহ সম্পূর্ণ একটি প্র্যাকটিক্যাল গাইড—যেখানে অভিভাবকদের জন্য সহজ, বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর দিকনির্দেশনা রয়েছে। সন্তানের সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী মানসিক বিকাশ গড়ে তুলতে আর্টিকেলটি মিস করবেন না। আরও উপকারী কনটেন্ট পেতে সাথে থাকুন Busy to Balance পরিবারের সঙ্গে।
2 thoughts on “হোম ম্যানেজমেন্টে সন্তান লালন-পালন ও তাঁদের যত্ন:”