আজকের দিনে কোনো official form-এ একজন নারী কী করেন, এই প্রশ্নের উত্তরে Housewife লিখতে গেলেও অনেক সময় সেটি গর্বের সঙ্গে লেখা যায় না। কারণ আমাদের সমাজে এখনও Housewife-এর কাজকে অনেক ক্ষেত্রেই ছোট করে দেখা হয়। এমন কিছু পুরোনো ধারণাও রয়েছে, যেখানে একজন বিবাহিত নারীর নিজের পরিচয় ও অবদানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আর তার সঙ্গে যেন অজান্তেই ছোট হয়ে যায় তাঁর সারাদিনের সংসারের কাজও।
অথচ একজন গৃহিণী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেন। বাচ্চা থেকে বয়স্ক—পরিবারের সবার যত্ন নেওয়া, রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, থালাবাসন ধোয়া, কাপড়ের যত্ন নেওয়া এবং সংসারের ছোট-বড় নানা কাজ সামলানো—সবকিছুর সঙ্গেই তিনি জড়িয়ে থাকেন। শুধু কাজ করাই নয়, কোন কাজ কখন করতে হবে, বাড়িতে কী প্রয়োজন, কার কী দরকার—এসবের planning-ও অনেক সময় তাঁকেই করতে হয়।
একই কাজ যদি একজন বেতনভুক্ত কাজের মাসি করেন, তাহলে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হয়। থালাবাসন ধোয়ার জন্য একরকম charge, ঘর পরিষ্কারের জন্য আলাদা charge, আবার রান্নার জন্যও আলাদা খরচ। অথচ একজন গৃহিণী যখন দিনের পর দিন একই কাজ করে যান, তখন সেই পরিশ্রমের আর্থিক মূল্য নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি।
তবে সত্যি বলতে, অনেক গৃহিণী তাঁদের কাজের বিনিময়ে শুধু টাকা চান না। সারাদিন এত কাজ করার পর পরিবারের কেউ যদি একবার বলে, “তুমি খুব পরিশ্রম করো, একটু বিশ্রাম নাও, নিজের যত্নও নাও”— এই স্বীকৃতিটুকুও তাঁদের কাছে অনেক মূল্যবান হতে পারে।
কিন্তু সেই কথার বদলে যদি শুনতে হয়, “সারাদিন তো ঘরেই থাকো, রান্না আর টুকটাক কাজ ছাড়া করোই বা কী?”—তাহলে সারাদিনের পরিশ্রমটাকে মূল্যহীন মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।
একজন গৃহিণী প্রতিদিন অনেক কাজই নীরবে করে থাকেন, কিন্তু সেই কাজের পেছনে থাকা তাঁর সময়, শ্রম, দায়িত্ব ও মানসিক পরিশ্রম অনেক সময় আমাদের চোখেই পড়ে না।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—সংসারের কাজ কি শুধু Housewife-এর দায়িত্ব? আর যে কাজের জন্য কোনো বেতন দেওয়া হয় না, তার মূল্য কি সত্যিই কম?
একজন Housewife আসলে সারাদিন কী করেন?
গৃহিণী সারাদিন শুধু কাজই করেন না, সেই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানসিক চাপ ও নানা ধরনের দায়িত্ব। দিনের পর দিন সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের বিশ্রাম ও প্রয়োজনকে পিছনে রাখার কারণে অনেক সময় তাঁর মধ্যে বিরক্তি বা খিটখিটে ভাব দেখা দিতে পারে। কখনও সেই মানসিক চাপের প্রভাব সন্তানদের সঙ্গেও তাঁর আচরণে পড়ে, এমনকি রাগের বশে বকাঝকা বা মারধরও করে ফেলতে পারেন।
কিন্তু একজন গৃহিণীর আচরণে এমন পরিবর্তন কেন আসে? এর উত্তর বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, তিনি সারাদিন আসলে কী কী করেন। কারণ ঘরের কাজ শুধু কাজ শেষ করে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়ের হিসাব, পরিবারের প্রত্যেকের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা, নানা দায়িত্ব পালন করা এবং অনেকটা মানসিক পরিশ্রম। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যেরই বোঝা উচিত, একজন গৃহিণী সারাদিন আসলে কী কী করেন।
সংসারের A to Z কাজ সামলানো
একজন গৃহিণীর দিনের শুরুই হয় সংসারের বিভিন্ন কাজ দিয়ে। সকালে ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পরিবারের জন্য টিফিন তৈরি করা, রান্না করা, রান্নার পর বাসন ধোয়া, কিচেন পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শোয়ার ঘর ও অন্যান্য ঘর গুছিয়ে রাখা—সংসারের প্রায় প্রতিটি কাজের সঙ্গেই তাঁকে যুক্ত থাকতে হয়। কাজ শেষ করার পর আবার নতুন কোনো কাজ শুরু হয়; ফলে দিনের একটা বড় সময়ই কেটে যায় সংসার সামলাতে।
বাচ্চার যত্ন নেওয়া
সংসারের কাজের পাশাপাশি সন্তানের যত্ন নেওয়াও একজন গৃহিণীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ছোট বাচ্চাকে খাওয়ানো, তার সুসু-পটি করা জামাকাপড় ও কাঁথা ধুয়ে দেওয়া, তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা—এসব কাজের জন্য আলাদা সময় ও ধৈর্য দরকার হয়। আবার বড় বাচ্চার ক্ষেত্রে স্কুলের টিফিন তৈরি করা, হোমওয়ার্ক বাকি থাকলে তা শেষ করতে সাহায্য করা, সময়মতো খাওয়ানো এবং পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখার মতো কাজও থাকে।
পরিবারের সবার প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা
সংসার সামলানো মানে শুধু রান্না করা বা ঘর পরিষ্কার করা নয়। পরিবারের কে কখন কী চাইছেন, কার কী প্রয়োজন, কোন জিনিস শেষ হয়ে আসছে বা কখন কী ব্যবস্থা করতে হবে—এসব বিষয়ের দিকেও একজন গৃহিণীকে নিয়মিত খেয়াল রাখতে হয়। অর্থাৎ পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো মনে রাখা এবং সময়মতো সেগুলোর ব্যবস্থা করাও তাঁর কাজেরই একটি অংশ।
আগামী দিনের কাজের পরিকল্পনা করে রাখা
একজন গৃহিণীকে শুধু আজকের কাজ নয়, অনেক সময় আগামী দিনের কাজও আগে থেকে ভেবে রাখতে হয়। যেমন, কাল কী রান্না হবে, কোন কোন রেশন বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ফুরিয়ে গেছে লিস্ট বানানো, পরশু কোথাও যাওয়ার থাকলে তার আগে কোন কোন কাজ শেষ করে রাখতে হবে—এসবও তাঁকে মনে রাখতে হয়। এমনকি বাচ্চার ভ্যাকসিনের তারিখ বা ডাক্তারের appointment সেগুলোও অনেক সময় একজন গৃহিণীকেই মনে রেখে সামলাতে হয়।
অর্থাৎ, একজন গৃহিণীর কাজ শুধু সামনে থাকা কাজগুলো শেষ করা নয়; আগামী দিনের অনেক কাজের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিও তাঁর দায়িত্বের অংশ।
গৃহিণীর কাজের মূল্য কম করে দেখা হয় কেন?
ভারতীয় সমাজের প্রচলিত কিছু ধারণায় ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়ের মনে এই ধারণা তৈরি করা হয় যে, নারী হিসেবে বিয়ে করে সংসার করা, সন্তান লালন-পালন করা এবং ঘরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব সামলানোই তাঁর প্রধান কর্তব্য। অন্যদিকে, অনেক ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, বড় হয়ে তাঁকে উপার্জন করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে।
সমস্যার শুরু হয় তখনই, যখন এই পুরোনো ধারণাগুলো বদলে যাওয়া সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার প্রসার ঘটছে, নারী-পুরুষ উভয়েই উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং নতুন প্রজন্ম পরিবার ও দায়িত্বকে আগের চেয়ে ভিন্নভাবে দেখতে শিখছে। ফলে পুরোনো ভূমিকা-ভিত্তিক ধারণা এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দ্বন্দ্ব।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই প্রশ্ন ওঠে—সংসারের কাজ কি শুধুই একজন নারীর দায়িত্ব? আর একজন গৃহিণী যদি সংসারের জন্য নিজের সময় ও শ্রম দেন, তাহলে সেই কাজের মূল্যই বা কম করে দেখা হবে কেন?
ঘরের কাজকে “কাজ” হিসেবে ধরা হয় না
একজন পুরুষ যেভাবে নিজের কাজের চাপ বা মানসিক স্ট্রেসকে প্রকাশ করতে পারেন, একজন গৃহিণী অনেক সময় সেভাবে নিজের কাজের চাপকে প্রকাশ করার সুযোগ পান না। কারণ পরিবারের অনেক সদস্যের কাছেই ঘরের কাজকে আলাদা করে “কাজ” বলে মনে হয় না। রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, সন্তানকে সামলানো বা পরিবারের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা—এসব যেন তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্ব।
অথচ বাইরের অফিসের কাজের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা থাকলেও একজন গৃহিণীর কাজের তেমন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। সকাল থেকে শুরু হওয়া কাজের ধারাবাহিকতা দিনের বিভিন্ন সময়ে চলতেই থাকে। একটি কাজ শেষ হলে অন্য একটি কাজ অপেক্ষা করে থাকে। তাই তাঁর কাজের পরিমাণ শুধু কতগুলো কাজ তিনি করেছেন, তা দিয়ে বোঝা যায় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, দায়িত্ব এবং মানসিক চাপ।
তাই আমাদের এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার যে সংসারের কাজ মানেই সেটা “কাজ নয়”। সংসারের কাজ হোক বা বাইরের অফিসের কাজ—সব কাজই কাজ। প্রতিটি কাজের পিছনেই সময়, শ্রম ও দায়িত্ব থাকে এবং সেই সঙ্গে মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে। কোনো কাজই কাজের বাইরে নয়।
বেতন না থাকায় গৃহিণীর কাজের মূল্য কম মনে হয়
আমাদের সমাজে অনেক সময় কোনো কাজের মূল্য বোঝার ক্ষেত্রে অর্থের একটা বড় ভূমিকা থাকে। যে কাজের জন্য টাকা দিতে হয়, সেই কাজকে আমরা সহজেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। অথচ একই কাজ যখন একজন গৃহিণী নিজের পরিবারের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে করেন, তখন সেটাকে অনেক সময় স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়।
সংসারের অন্যান্য কাজ বাদ দিলেও শুধু একটি ছোট শিশুর যত্ন নেওয়ার কথাই ধরা যাক। একটি ছোট সন্তানকে সারাদিন সামলানো, সময়মতো খাওয়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, তার কান্না বা অস্বস্তির কারণ বোঝা এবং সব সময় তার দিকে নজর রাখা—এগুলো মোটেও সহজ কাজ নয়। এর জন্য ধৈর্য, সময় ও একটানা মনোযোগের প্রয়োজন হয়। তাই শিশুর যত্ন নেওয়াকে শুধু “মায়ের স্বাভাবিক দায়িত্ব” বলে দেখলে এই কাজের পরিশ্রমটাকে ছোট করে দেখা হয়।
একজন কর্মরত মা-বাবা জানেন, ছোট সন্তানের দেখাশোনার জন্য একজন আয়া রাখতে হলে মাসে একটি নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থ খরচ করার পরও সন্তানের যত্ন সবসময় নিজের মনের মতো হবে, এমন নিশ্চয়তা থাকে না। অথচ একজন গৃহিণী নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে প্রতিদিন সেই দায়িত্ব পালন করেন, যার জন্য তিনি কোনো বেতন পান না। সন্তান লালন-পালন ও তার যত্ন নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন— “হোম ম্যানেজমেন্টে সন্তান লালন-পালন ও তাঁদের যত্ন”।
একজন গৃহিণী নিজের পরিবার, স্বামী ও সন্তানের কথা ভেবে প্রতিদিন সংসারের নানা দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁর এই কাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বেতন থাকে না, কিন্তু তাই বলে সেই কাজের মূল্য কমে যায় না। তাই শুধু অর্থ দিয়ে কোনো কাজের মূল্য নির্ধারণ না করে, একজন গৃহিণীর সময়, শ্রম, দায়িত্ব ও পরিশ্রমকেও সম্মান করা উচিত। কারণ সংসার পরিচালনার পিছনেও থাকে অনেক সময়, ধৈর্য ও মানসিক পরিশ্রম।
সংসারের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই
সংসার সামলানো কোনো অফিসের কাজের চেয়ে কম নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কাজ কখন শুরু হবে বা কখন শেষ হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। একজন গৃহিণীর সকাল শুরু হয় সংসারের কাজ দিয়ে, আর দিনের নানা কাজ সামলাতে সামলাতে অনেক সময় রাত হয়ে যায়। অথচ এই দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম অনেকেরই চোখে পড়ে না।
অফিসে সাধারণত প্রত্যেক কর্মীর নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে এবং সেই দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সংসারের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজন ও দৈনন্দিন কাজের বড় একটি অংশ অনেক সময় একজন গৃহিণীকেই সামলাতে হয়। রান্না, ঘর পরিষ্কার, সন্তানকে দেখা থেকে শুরু করে পরিবারের নানা প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কাজের কোনো নির্দিষ্ট শেষ সময় থাকে না।
তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের একবার হলেও ভাবা উচিত—একজন গৃহিণী কি সত্যিই সারাদিন ঘরে থেকে বিশ্রাম নেন, নাকি ঘরের অদৃশ্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের দায়িত্ব পালন করে চলেন?
সংসারের কাজ কি শুধু Housewife-এর দায়িত্ব?
সংসারের কাজ মানেই যে শুধু একজন Housewife-এর দায়িত্ব—এই ধারণা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই চলে আসছে। এমনকি কখনও কখনও ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতির নাম করেও এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছে মানে মায়ের জন্য যেন একজন “দাসী” আনতে যাচ্ছে। আবার কোথাও এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, বিয়ের পর একজন বউয়ের দায়িত্ব শুধু স্বামী নয়, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সেবা করা।
কিন্তু এগুলোকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা হিসেবে দেখার আগে আমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার। কোনো ধর্মের শিক্ষাকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে একজন নারীর ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ধর্মের নামে কোনো নারীকে অসম্মান করা বা তাঁর ওপর জুলুম করা ধর্মের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
একজন নারী সাধারণত জীবনের প্রথম ২০–২৫ বছর বাবা-মা, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের মধ্যে বড় হয়ে ওঠেন। তারপর বিয়ের পর তাঁকে নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবার, নতুন মানুষ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। অনেক নারী নিজের সংসারকে ভালোবেসে এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন এবং পরিবারের জন্য অনেক ত্যাগও করেন। কিন্তু এই ত্যাগকে তাঁর বাধ্যতামূলক কর্তব্য হিসেবে দেখানো উচিত নয়।
কোনো নারী যদি নিজের ইচ্ছায় শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর-ননদসহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিতে চান, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। কিন্তু তাঁর ওপর এমন কোনো চাপ তৈরি করা উচিত নয় যে, বিয়ে করেছেন বলেই পরিবারের প্রতিটি কাজ এবং প্রত্যেক সদস্যের দেখাশোনা করাই তাঁর একমাত্র দায়িত্ব।
সংসার একটি পরিবারের। তাই সংসারের দায়িত্বও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভাগ হওয়া উচিত। ধর্মের নাম করে একজন গৃহবধূর ওপর অন্যায় দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে, তাঁর ইচ্ছা, সময় ও শ্রমের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। এর ফলে একজন নারীর কাছে সংসার শুধু দায়িত্বের জায়গা হয়ে থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে নিজের পরিবার
সংসারের কাজ ভাগ করে নেওয়া কেন জরুরি?
সংসারের কাজ ভাগ করে নেওয়া মানে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা বা কে বেশি কাজ করল, কে কম কাজ করল, তা নিয়ে মনে রাগ বা অভিযোগ পুষে রাখা নয়। বরং পরিবারের প্রত্যেকের মধ্যেই এমন একটি মানসিকতা তৈরি হওয়া দরকার—আজ আমি সারাদিন সংসারের জন্য কী কী কাজ করলাম, আর পরিবারের অন্য সদস্যরা কী কী কাজ করল? প্রত্যেকের মধ্যে এই অনুভবের মানসিকতা জাগানো দরকার। নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের কাজের দিকেও একটু খেয়াল রাখার অভ্যাস তৈরি হলে খুব সহজেই বোঝা যায়, একজন কতটা পরিশ্রম করছেন এবং তাঁর ওপর কতটা চাপ রয়েছে।
একজনের ওপর কাজের চাপ কমে
সংসারের কাজ ভাগ করে নিলে একজনের ওপর সব কাজের চাপ থাকে না। ফলে গৃহিণীও কিছুটা সময় বিশ্রাম নেওয়া বা নিজের প্রয়োজনের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ পান।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়
পরিবারের প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু কাজের দায়িত্ব নিলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
সংসারে সময়ের ভারসাম্য তৈরি হয়
সংসারের সব কাজ যদি একজনকেই একা সামলাতে হয়, তাহলে একই সময়ে অনেক কাজের চাপ এসে পড়ে। ফলে সময়ের সঠিক ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কিছু কাজ ভাগ করে নিলে কাজের চাপ যেমন কমে, তেমনই সময়ও আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
সংসারের কাজ কীভাবে পরিকল্পনা করে কম সময়ে এবং সহজভাবে করা যায়, সে বিষয়ে গৃহ পরিচালনায় সময় ব্যবস্থাপনা; গৃহকর্মে সময় বাঁচানোর কৌশল আর্টিক্যালে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
একে অপরের পরিশ্রমের মূল্য বোঝা যায়
পরিবারের সদস্যরা যখন নিজেরাও সংসারের কিছু কাজ করেন, তখন অন্যের পরিশ্রমটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। এতে গৃহিণীর প্রতিদিনের সময়, শ্রম ও দায়িত্বের মূল্য উপলব্ধি করা সহজ হয়।
পরিবারের সদস্যরা কীভাবে একসঙ্গে সংসারের কাজে সহযোগিতা করবেন?
পরিবারের সবাই মিলে সংসারের কাজে সহযোগিতা করলে একজনের ওপর থেকে কাজের চাপ কমে এবং সংসারের কাজও আরও সহজভাবে সামলানো যায়। তবে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সময়, সক্ষমতা ও বয়সের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাই বাস্তবে কীভাবে পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারেন, তা একটু দেখে নেওয়া যাক।
সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ করুন
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সময় ও সক্ষমতা একরকম নয়। তাই সবার পরিস্থিতি বুঝে কে কোন কাজটি করতে পারবেন, সেই অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ করা উচিত। এতে কারও ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে না এবং সংসারের কাজগুলোও সহজভাবে সামলানো যায়।
সন্তানদের বয়স অনুযায়ী ছোট দায়িত্ব দিন
সন্তানের বয়স ৩ বছর হওয়ার পর থেকেই তাকে ছোট ছোট কাজের সঙ্গে অভ্যস্ত করা যেতে পারে। যেমন, খেলা শেষ হয়ে গেলে খেলনাগুলো খেলনার নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখতে বলা, ব্যবহার করা জামাকাপড় যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট ঝুড়িতে রাখতে শেখানো ইত্যাদি।
ছোটবেলা থেকেই এভাবে নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে ধীরে ধীরে সন্তান নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো নিজেই করার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি পরিবারের কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করার মানসিকতাও তার মধ্যে তৈরি হবে।
কাজকে জেন্ডারভিত্তিক না দেখা
পৃথিবীতে কোনো কাজই লিঙ্গভিত্তিক হওয়া উচিত নয়। কিন্তু এখনও অনেক মানুষ মনে করেন, “এটা ছেলেদের কাজ নয়” অথবা “এটা মেয়েদের কাজ নয়।” অথচ কাজ তো কাজই—কাজের কোনো নির্দিষ্ট Gender হয় না।
তবে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে মা ও বাবার ভূমিকা সবসময় একরকম হয় না। একজন মা সন্তানের জন্মের আগে থেকেই যে শারীরিক ও মানসিকভাবে সন্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তার প্রভাব সন্তানের যত্ন ও লালন-পালনেও স্বাভাবিকভাবেই পড়ে। তাই সন্তানের যত্নে মায়ের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাবা সন্তানকে যত্ন করতে পারেন না বা সংসারের দায়িত্ব নিতে পারেন না।
একজন বাবা-ও সন্তানের যত্ন নিতে পারেন, ঘরের কাজ করতে পারেন এবং পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারেন। বরং একটি পরিবারে মা ও বাবার ভূমিকা আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুজনের অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা হয় তখনই, যখন কেউ মনে করেন—“সংসারের কাজ মানেই মহিলার কাজ।” রান্না, থালাবাসন, ঘর পরিষ্কার কিংবা সন্তানের যত্ন—এসব কাজের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট Gender-এর সম্পর্ক নেই। পরিবারের যে সদস্য যে কাজটি করতে পারেন, সেই কাজের দায়িত্ব তিনি নিতে পারেন।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়া শুধু তাঁদের নিজেদের সম্পর্ককেই সুন্দর করে না, সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশের ওপরও তার প্রভাব ফেলতে পারে। “স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ সম্পর্কই গড়ে তোলে সন্তানের ভবিষ্যৎ”।
সংসার যদি দুজনের হয়, তাহলে সংসারের দায়িত্বও শুধু একজনের হবে কেন?