প্রথমবার মা হওয়ার অনুভূতি নিঃসন্দেহে একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে বিশেষ অনুভূতিগুলোর একটি। কিন্তু এই আনন্দের পাশাপাশি একজন মাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও যেতে হয়। প্রেগন্যান্সি থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত দীর্ঘ একটি জার্নি, আর সন্তানের জন্মের পর শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন আরেকটি অধ্যায়।
এই সময় একজন মায়ের পাশে তাঁর Partner কতটা থাকছেন, সেটাও কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় একজন Partner মনে করেন, “বাচ্চা তো হয়ে গেছে, এখন তো আনন্দের সময়”—অথচ সেই সময়টাতেই একজন মা হয়তো নিজের শরীর, ঘুম, মানসিক চাপ এবং নতুন দায়িত্বের সঙ্গে প্রতিদিন মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাহলে একজন Partner-এর কাছ থেকে একজন নতুন মা আসলে কী আশা করেন? আর সব সময় পাশে থাকা বলতে কি শুধু বড় বড় দায়িত্ব নেওয়াকেই বোঝায়? আসলে সমস্যা অনেক সময় ভালোবাসার অভাবে হয় না। একে অপরের এই নতুন অবস্থাটাকে কীভাবে বুঝতে হবে, কীভাবে পাশে থাকতে হবে—সেটাই অনেক সময় দুজনের জানা থাকে না।
অনেক নারীই অভিযোগ করেন, মা হওয়ার এই কঠিন সময়টায় তাঁরা Partner-এর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। কখনও Partner-এর অজান্তে বলা একটি কথা, কখনও ছোট একটি অবহেলা, আবার কখনও “এটা তো সব মায়েরই হয়” বলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখা—এসব ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে misunderstanding তৈরি করতে পারে। এমনকি পরবর্তীতে সম্পর্কের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
আবার প্রথমবার মা হওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকায় একজন নারী নিজেও অনেক ছোট ছোট বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়তে পারেন। প্রেগন্যান্সির সময় শরীরে নানা ধরনের স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে, কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা না থাকলে স্বাভাবিক বিষয়ও অনেক সময় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই যদি বলি, প্রেগন্যান্সির সময় এত বেশি বমি হতো যে বমি হওয়ার ভয়ে আমি অনেক সময় ঠিকমতো খেতেই পারতাম না। ফলে নিজের পাশাপাশি সন্তানের ওজন নিয়েও চিন্তায় পড়তে হয়েছিল। পরে বুঝেছি, শুধু ভয়ের কারণে খাবার কমিয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়; বরং কোন বিষয়টি স্বাভাবিক, কোন ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া দরকার এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—এসব জানা অনেক বেশি জরুরি।
তাই প্রথমবার মা হওয়ার পর কোন বিষয়গুলো স্বাভাবিক হতে পারে, কোন পরিস্থিতিতে একজন মায়ের নিজের যত্ন নেওয়া জরুরি এবং এই পুরো জার্নিতে একজন Partner কীভাবে বাস্তবভাবে পাশে থাকতে পারেন—এসব বিষয় বোঝা দুজনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ মা হওয়ার জার্নি শুধু একজন নারীর একার নয়। সন্তান দুজনের হলে, সেই নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জার্নিটাও দুজনের হওয়া উচিত।
প্রথমবার মা হওয়ার পর কেন সবকিছু নতুন মনে হয়?
এক কথায় বলা যায়, প্রথমবার মা হওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকায় শরীর ও মনের অনেক পরিবর্তনই একজন নতুন মায়ের কাছে নতুন মনে হয়। তাই স্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়েও অনেক সময় দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। আবার খুব অল্প বয়সে কেউ মা হলে নিজের শরীরের পরিবর্তন, শিশুর যত্ন এবং কোন পরিস্থিতিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার—এসব বোঝার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে। ফলে স্বাভাবিক ও গুরুতর সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে কখনও অসুবিধা হতে পারে।
অন্যদিকে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীও প্রথমবার মা হওয়ার পর নিজের শরীরের প্রতিটি পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে অজান্তেই অনেক বেশি চিন্তা করে ফেলতে পারেন। যেমন, একদিন বমি বা গ্যাস-অ্যাসিডিটির সমস্যা হওয়ার পর তিনি হয়তো আগের দিনের খাবারের সঙ্গে সেটার সম্পর্ক খুঁজে দেখলেন এবং সেই খাবারটি খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। অথচ সব সময় যে ওই খাবারটির কারণেই সমস্যা হয়েছে, তা নয়। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পর শরীরে নানা পরিবর্তন হয়, তাই নতুন মায়ের কোনো শারীরিক সমস্যা হলে শুধু অনুমান করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বেশি নিরাপদ।
প্রথমবার মা হওয়ার পর কোন কোন বিষয় স্বাভাবিক হতে পারে?
প্রথমবার মা হওয়ার পর শরীর ও মনের নানা পরিবর্তনকে ঘিরে নতুন মায়ের মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কখনও ক্লান্তি, কখনও ঘুমের পরিবর্তন, আবার কখনও নিজের অনুভূতি নিয়েও অস্বস্তি হতে পারে। এগুলোর কিছু নতুন মাতৃত্বের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবর্তন নিয়ে ভয় পাওয়ার আগে কোন বিষয়গুলো সাধারণভাবে হতে পারে, সেগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
সব সময় ক্লান্ত লাগা বা পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
সন্তান হওয়ার পর একজন মায়ের ঘুমের সময় অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে যায়। বাচ্চা কখন ঘুমাবে বা কখন জেগে উঠবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। তাই রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং সারাদিন ক্লান্ত লাগা এই সময়ে খুবই স্বাভাবিক।
শিশুকে নিয়ে বারবার চিন্তা হওয়া
প্রথমবার মা হলে শিশুর ছোট ছোট বিষয় নিয়েও চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। বাচ্চা ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, বেশি কাঁদছে কেন, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি না—এসব নিয়ে বারবার মনে প্রশ্ন আসতে পারে। কারণ নতুন মা ধীরে ধীরে শিশুর আচরণ বুঝতে শিখছেন।
নিজের জন্য সময় না পাওয়া
সন্তান জন্মের পর দিনের বেশিরভাগ সময়ই শিশুর যত্ন নিতে চলে যায়। ফলে নিজের খাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া বা একটু নিজের মতো সময় কাটানোর সুযোগও অনেক সময় পাওয়া যায় না। তাই নিজের জন্য সময় না পাওয়ায় বিরক্ত বা মন খারাপ লাগলেও নিজেকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। এই সময়ে ঘরের দৈনন্দিন কাজগুলো একটু পরিকল্পনা করে সামলাতে পারলে মায়ের ওপর কাজের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
আবেগের দ্রুত পরিবর্তন হওয়া
একজন নতুন মা হওয়ার পর নিজের আবেগকেও অনেক সময় ঠিকভাবে বোঝা যায় না। কখনও বাচ্চাকে দেখে খুব আনন্দ হয়, আবার কখনও বাচ্চা কেন কাঁদছে বুঝতে না পেরে নিজেরই খুব অসহায় আর বিরক্ত লাগতে পারে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার বাচ্চা যখন খুব কাঁদত, তখন অনেক সময় বুঝতেই পারতাম না ও শরীর খারাপের জন্য কাঁদছে, নাকি অন্য কোনো কারণে। একদিন ও এত বেশি কাঁদছিল যে আমি নিজেই বিরক্ত ও কষ্ট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে ফেলেছিলাম, “এ বাচ্চা আমার দরকার নেই, কে নেবে ওকে দিয়ে দাও!” 😭
এখন কথাটা মনে পড়লে নিজেরই হাসি পায়। কিন্তু সেই মুহূর্তে সত্যিই খুব অসহায় লাগছিল। আসলে তখন আমি বাচ্চাকে ভালোবাসতাম না এমন নয়, বরং কীভাবে ওর কান্না বুঝব, কীভাবে ওকে শান্ত করব—সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। নতুন মা হওয়ার সময় এমন মুহূর্ত আসতেই পারে, আর সেই মুহূর্তের জন্য নিজেকে খারাপ মা ভাবার কোনো কারণ নেই।
প্রথমবার মা হওয়ার পর মায়েরা কোন কোন সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন?
প্রথমবার মা হওয়ার পর শিশুর যত্নের পাশাপাশি মাকেও নিজের শরীর ও মানসিক অবস্থার নানা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। কিছু বিষয় সাধারণ হলেও নতুন মায়ের কাছে তা বেশ কঠিন বা চিন্তার কারণ হতে পারে। তাই এই সময়ে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে পারেন, সেগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই একটু ধারণা থাকা জরুরি।
বুকের দুধ নিয়ে দুশ্চিন্তা: বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কিনা কীভাবে বুঝবেন?
প্রথমবার মা হওয়ার পর সবচেয়ে সাধারণ চিন্তার একটি বিষয় হলো—“আমার বাচ্চা কি ঠিকমতো বুকের দুধ পাচ্ছে?” প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক নতুন মা বুঝতে পারেন না, বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কিনা।
বাচ্চা একটু বেশি কাঁদলেই মনে হতে পারে, “বোধহয় আমার দুধে ওর পেট ভরছে না।” এই ভুলটা আমিও করেছিলাম। পরে বুঝেছি, বাচ্চা কাঁদছে মানেই যে সে খিদে পেয়েছে বা বুকের দুধে পেট ভরছে না—এমনটা নয়। তাই শুধু কান্না দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, বাচ্চা কতবার দুধ খাচ্ছে, পর্যাপ্ত প্রস্রাব হচ্ছে কিনা এবং ওজন ঠিকভাবে বাড়ছে কিনা—এসব বিষয়ও লক্ষ্য করা দরকার।
দুধ নিয়ে সন্দেহ হলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নেওয়াই ভালো, বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কিনা। কারণ প্রতিটি শিশুর চাহিদা একরকম নয়।
আর একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, নিয়মিত breastfeeding দুধ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চা যতবার স্তন চুষে দুধ খায়, ততবার মায়ের শরীর দুধ তৈরি করার সংকেত পায়।। তাই দুধ কম হচ্ছে মনে হলেই তাড়াহুড়ো করে বাইরের দুধ শুরু না করে আগে কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক বা lactation consultant-এর পরামর্শ নিন।
শিশুর শ্বাসকষ্ট সমস্যা
শিশুর জন্মের পর শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিলে নতুন মায়েরা স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে যান। তার ওপর মায়ের নিজের শরীর ও মনও তখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে না। শিশুর সর্দি-কাশির কারণে দুধ খেতে অসুবিধা হলে চিকিৎসক নেবুলাইজেশন, ওষুধ বা প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিতে পারেন।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার বাচ্চাকেও নেবুলাইজেশন দিতে হতো। কিন্তু আশপাশের অনেকেই বলতেন, এতে নাকি অভ্যাস হয়ে যায়, তাই অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ দিতে বলতেন। এমন কথায় আমি চিন্তিত হয়ে পড়তাম। অথচ আমার চিকিৎসক বুঝিয়েছিলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী নেবুলাইজেশন দেওয়া নিয়ে অকারণে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। তাই সবাইকে অনুরোধ করব, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা নিয়ে নিজের মতো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না বা ভুল তথ্য দিয়ে নতুন মায়েদের ভয় পাইয়ে দেবেন না।
ডেলিভারির পর পেট ও Backside-এর ব্যথা
সিজারিয়ান ডেলিভারির পর অনেক মায়ের কোমর বা পিঠে ব্যথা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, সিজারের আগে মেরুদণ্ডের কাছে যে ইনজেকশন দেওয়া হয়, সেটাই এই ব্যথার কারণ। কিন্তু সব সময় এমনটা নয়। ডেলিভারির পর শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন, পেশির ওপর চাপ এবং অন্যান্য কারণেও পেট, কোমর বা পিঠে ব্যথা হতে পারে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ডেলিভারির পর দীর্ঘদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে খুব অসুবিধা হতো। কখনও দেওয়াল ধরে, পা মেঝেতে ঘষতে ঘষতে হাঁটতে হতো। সেই সময় বুঝেছিলাম, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মায়ের শরীরকে সুস্থ হয়ে উঠতে সময় দিতে হয়।
তবে মনে রাখবেন, ডেলিভারির পর কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে বলে তীব্র ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। ব্যথা খুব বেশি হলে, দীর্ঘদিন থাকলে বা হাঁটাচলায় অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেলিভারির পর নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া বন্ধ করবেন না। চিকিৎসক যদি ক্যালসিয়াম বা অন্য কোনও ওষুধ খেতে বলেন, তাহলে তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী সেগুলি চালিয়ে যান। অনেক মা ভাবেন, সন্তান জন্ম হয়ে গিয়েছে, তাই এখন আর ক্যালসিয়াম খাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রসবের পরেও মায়ের পুষ্টি ও সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় যেমন নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্তান জন্মের পরেও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ে শুধু শিশুর যত্ন নিলেই হবে না, মাকেও সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে।
একজন Partner কীভাবে সত্যিকারের মায়ের পাশে থাকতে পারেন?
Partner কথার অর্থ শুধু জীবনসঙ্গী নয়, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে একে অপরের পাশে থাকা। দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ প্রতিটি পরিস্থিতি দুজনে মিলে সামলানোর কথা। তাই একজন স্ত্রী যখন মা হন, তখন সন্তানের জন্ম হয়েছে বলেই যে তার যত্ন নেওয়া ও তাকে ঘিরে সব দায়িত্ব শুধু মায়ের—এমনটা ভাবা ঠিক নয়।
সন্তান জন্ম দেওয়ার পর একজন মাকে একদিকে যেমন নিজের শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, অন্যদিকে শিশুর যত্ন নেওয়ার নতুন দায়িত্বও সামলাতে হয়। এই সময়ে স্বামীর সামান্য সাহায্য, একটু বোঝাপড়া কিংবা মন দিয়ে স্ত্রীর কথা শোনাও তাঁর কাছে অনেক বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে। কারণ একজন স্ত্রী অনেক সময় তাঁর মনের কথা সবার কাছে খুলে বলতে না পারলেও জীবনসঙ্গীর কাছে মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা আশা করেন।
তাই সত্যিকারের Partner হওয়ার অর্থ শুধু স্ত্রীর পাশে থাকা নয়, বরং তাঁর পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা, প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং তাঁকে এই অনুভূতি দেওয়া যে নতুন মাতৃত্বের পুরো যাত্রাটা তাঁকে একা সামলাতে হবে না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখবেন—”স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ সম্পর্কই গড়ে তোলে সন্তানের ভবিষ্যৎ।”
শুধু শিশুর নয়, মায়েরও খোঁজ নিন
সন্তান জন্মের পর পরিবারের সবার নজর থাকে শিশুর দিকে। বাচ্চা ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, ঘুমাচ্ছে কি না, শরীর ভালো আছে কি না—এসব নিয়েই ব্যস্ততা চলে। কিন্তু এই সময়ে মায়েরও যে শরীর খারাপ থাকতে পারে, ক্লান্ত লাগতে পারে বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন, সেটাও মনে রাখা জরুরি।
একজন Partner হিসেবে শুধু বাচ্চার খোঁজ নিলেই হবে না, স্ত্রী কেমন আছেন সেটাও জানতে হবে। তিনি ঠিকমতো খেয়েছেন কি না, বিশ্রাম নিতে পারছেন কি না, কোথাও ব্যথা হচ্ছে কি না—এই ছোট ছোট বিষয়গুলো খেয়াল করুন। অনেক সময় স্ত্রী নিজে থেকে সব কথা বলতে পারেন না। তাই তাঁর মুখে অভিযোগ শোনার অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই খোঁজ নিন।
মা না বললেও কিছু দায়িত্ব নিজে থেকে নিন
একজন নতুন মায়ের সারাদিনের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, ডায়াপার বা জামাকাপড় বদলানো—সবকিছুর মধ্যে কখন যে দিন কেটে যায়, তিনি বুঝতেই পারেন না। এর মধ্যে ঘরের কাজও সামলাতে হলে তাঁর ক্লান্তি আরও বেড়ে যায়।
তাই স্ত্রীকে প্রতিটি কাজের জন্য সাহায্য চাইতে হবে, এমনটা ভাববেন না। আপনি নিজে থেকেই বাচ্চার ডায়াপার বদলে দিতে পারেন, ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন অথবা কিছুক্ষণ বাচ্চাকে সামলাতে পারেন, যাতে স্ত্রী নিশ্চিন্তে খাওয়া-দাওয়া বা বিশ্রাম নিতে পারেন। মনে রাখবেন, সাহায্য করার জন্য স্ত্রীকে বারবার বলতে হলে তাঁর ওপরও একটা মানসিক চাপ তৈরি হয়।
মায়ের বিশ্রামের জন্য সময় বের করে দিন
সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের শরীরকে সুস্থ হয়ে উঠতে সময় দিতে হয়। কিন্তু বাচ্চা বারবার জেগে উঠলে বা কাঁদলে অনেক সময় মা একটানা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি জমতে থাকে।এই সময়ে Partner যদি কিছুক্ষণ শিশুর দায়িত্ব নেন, তাহলে মা একটু ঘুমাতে পারেন বা নিজের মতো করে বিশ্রাম নিতে পারেন। মনে রাখবেন, বিশ্রাম নেওয়া মানে মা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন না। বরং তাঁর শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার জন্যও বিশ্রাম প্রয়োজন।
স্ত্রীর কথা শুনুন, সঙ্গে সঙ্গে বিচার করতে যাবেন না
নতুন মা হওয়ার পর অনেক ছোট ছোট বিষয় নিয়েও দুশ্চিন্তা হতে পারে। কখনও বাচ্চার কান্না বুঝতে না পেরে, কখনও দুধ খাওয়ানো নিয়ে চিন্তায়, আবার কখনও নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়ে মা অস্থির হয়ে পড়তে পারেন।
এই সময়ে স্ত্রী কিছু বললে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। “এত চিন্তা করছ কেন?”, “অন্য মায়েরাও তো বাচ্চা সামলায়” বা “এটা এমন কিছু নয়”—এ ধরনের কথা তাঁর কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বরং তাঁর কথা মন দিয়ে শুনুন। সব সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে না; কখনও কখনও পাশে থেকে কথা শোনাটাই অনেক বড় সমর্থন।
শিশুর যত্নকে শুধু মায়ের দায়িত্ব মনে করবেন না
বাবা হয়তো চাকরি বা কাজের জন্য দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকেন। তবুও বাড়ি ফিরে শিশুর যত্নে অংশ নিতে পারেন, মায়ের কাজ কিছুটা ভাগ করে নিতে পারেন। আর ছুটির দিনে শুধু নিজের বিশ্রামের কথা না ভেবে স্ত্রীকেও বিশ্রামের সুযোগ দিতে পারেন। এতে মা একা সব সামলাচ্ছেন—এমন অনুভূতি কমবে এবং সন্তানের সঙ্গে বাবার সম্পর্কও আরও গভীর হবে।
অনেক পরিবারে এখনও মনে করা হয়, বাচ্চার যত্ন নেওয়া মূলত মায়ের কাজ, আর বাবা বাইরে কাজ করে সংসারের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু সন্তান দুজনের হলে তার যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও দুজনের। শুধু শিশুকে খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানো নয়, তার মানসিক বিকাশের দিকেও বাবা-মা দুজনের নজর রাখা জরুরি।
শেষ কথা
প্রথমবার মা হওয়া যেমন আনন্দের, তেমনই নতুন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ নয়। এই সময়ে একজন মায়ের যেমন নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন, তেমনই তাঁর Partner-এরও উচিত তাঁকে বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা।
মনে রাখবেন, একজন মা একদিনেই সবকিছু শিখে যান না। সন্তানকে বুঝতে বুঝতে, তার যত্ন নিতে নিতেই তিনি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তাই এই সময়ে তাঁকে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার বদলে সাহস দিন, তাঁর কথা শুনুন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নিন।
সন্তান দুজনের হলে, সেই নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জার্নিটাও দুজনের হওয়া উচিত।